২৫ শতাংশ শুল্ক

মার্কিন ওষুধ শিল্পে খরচ বাড়বে ৫১০০ কোটি ডলার

যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে দেশটিতে বছরে ওষুধ ব্যয় প্রায় ৫১ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ১০০ কোটি ডলার বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে দেশটিতে বছরে ওষুধ ব্যয় প্রায় ৫১ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ১০০ কোটি ডলার বাড়তে পারে। এ ব্যয়ের পুরোটা ভোক্তাদের ওপর চাপানো হলে ওষুধের দাম সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। মার্কিন ওষুধ শিল্পসংশ্লিষ্ট ফার্মাসিউটিক্যালস রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অব আমেরিকার উদ্যোগ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং পরিচালিত এ বিশ্লেষণে তথ্যটি উঠে এসেছে। এছাড়া জেনেরিক ওষুধের ওপর শুল্কের প্রভাব নিয়ে অনেক দিন ধরে দেশটিতে আলোচনা হচ্ছে। খবর রয়টার্স ও এফটি।

আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ২০ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের ওষুধ আমদানি করেছে, যার ৭৩ শতাংশ এসেছে ইউরোপ—মূলত আয়ারল্যান্ড, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ড থেকে। একই বছরে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত ও বিক্রীত ওষুধের মোট মূল্য ছিল ৩৯ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।

এদিকে কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের জেনেরিক ওষুধ শিল্পসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছে, শুল্ক আরোপ করা হলে ক্যান্সার চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। কারণ এতে অনেক প্রস্তুতকারক সংস্থা এমন ওষুধ উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে, যেগুলো শুল্কের পর লোকসানের মুখে পড়বে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত মোট ওষুধের প্রায় ৯০ শতাংশই জেনেরিক ওষুধ, যেগুলো মূলত ভারত ও চীনের মতো নিম্ন-উৎপাদন ব্যয়ের দেশে তৈরি হয়। অধিকাংশ জেনেরিক ওষুধের কাঁচামাল বা সক্রিয় উপাদান (এপিআই) চীন থেকে আসে। শুরুতে ওষুধ খাতকে শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছিল, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ওষুধ আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন ‘জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি’ দেখিয়ে ওষুধ আমদানির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তর এ তদন্তের অংশ হিসেবে ২১ দিনের জনমত গ্রহণের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। যদিও তদন্তের আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশে নয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক ইঙ্গিত দিয়েছেন, এক-দুই মাসের মধ্যেই শুল্ক কার্যকর হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জেনেরিক ওষুধ সংস্থাগুলোর লবিং গ্রুপ অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যাকসেসিবল মেডিসিনসের প্রধান নির্বাহী জন মারফি সতর্ক করে বলেছেন, ‘এ শুল্ক রোগীদের কোনো উপকার করবে না এবং স্বাস্থ্য খাতের নিরাপত্তাও বাড়াবে না।’

তার মতে, পুরনো ইনজেকটেবল ওষুধ, বিশেষ করে ক্যান্সারের কেমোথেরাপি ওষুধের জোগানে সংকট তৈরি হতে পারে। শুল্কের কারণে অনেক সস্তা জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন আর লাভজনক থাকবে না এবং উৎপাদকরা সেগুলো তৈরি বন্ধ করে দিতে পারে।

ভারতের হেটারো ফার্মার চেয়ারম্যান বি পার্থসারথী রেড্ডি জানিয়েছেন, শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় ওষুধের দাম বাড়বে এবং বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। ভারত বিশ্বজুড়ে জেনেরিক ওষুধের ২০ শতাংশ এবং সাশ্রয়ী মূল্যের টিকার ৬০ শতাংশ সরবরাহ করে।

এছাড়া ডাচ ব্যাংক আইএনজি হিসাব করে দেখিয়েছে, ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে ক্যান্সারের একটি জেনেরিক ওষুধের ২৪ সপ্তাহের চিকিৎসা খরচ ৮-১০ হাজার ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। আইএনজির ফার্মাসিউটিক্যালস ও হেলথকেয়ার শাখার বৈশ্বিক প্রধান স্টিফেন ফারেলির মতে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন স্বাস্থ্য বীমা না থাকা রোগীরা। তবে বীমা থাকা ব্যক্তিদের জন্যও প্রিমিয়াম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভারতীয় ওষুধ বিশ্লেষক প্রশান্ত রেড্ডি মন্তব্য করেছেন, ‘এসব ওষুধ অনেক সময় শুধু ভারতেই তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র যদি শুল্ক আরোপ করে, তাহলে নিজেদেরই ক্ষতি করবে। এতে শুধু দামই বাড়বে, অর্জন কিছুই হবে না।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ শুল্ক আরোপের ফলে শুধু ব্যয় বৃদ্ধি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতালগুলোর জন্য ওষুধের জোগান সংকটও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এর শেষ পরিণতি ভোগ করতে হবে সাধারণ রোগী ও ভোক্তাদেরই।

আরও